সকল মেনু

বড় চ্যালেঞ্জ অর্ডার বাঁচানো

ইরান যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে হাঁসফাঁস অবস্থা চলছে দেশের তৈরি পোশাক খাতে। লোডশেডিংয়ের কারণে ঢাকার সাভার-আশুলিয়া ও গাজীপুরের কোনাবাড়ী অঞ্চলে বিদ্যুৎবিহীন থাকছে দিনের প্রায় ৪ থেকে ৬ ঘণ্টা। চট্টগ্রামসহ অন্যান্য অঞ্চলের অবস্থা আরও খারাপ। বিজিএমইএ সদস্যভুক্ত কারখানাগুলোকে ফুয়েল পাস দিলেও সুফল মিলছে খুবই কম। এসব কারণে সার্বিকভাবে পোশাক কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কমে গেছে। পাশাপাশি পরিবহন খরচ বেড়ে গেছে। বিদেশি ক্রেতারাও এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বলে জানা গেছে। এমন পরিস্থিতিতে বিদেশি ক্রেতাদের দেওয়া অর্ডার রক্ষা করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, একদিকে অর্ডার কমছে, অন্যদিকে উৎপাদন কমছে। অর্ডার অনুযায়ী সরবরাহ দেওয়া যাচ্ছে না। ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলোর অবস্থা বেশি খারাপ। ইতোমধ্যে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক কারখানার নিভু নিভু অবস্থা।

এমন পরিস্থিতিতে দেশে যতটুকু জ্বালানি আছেÑ তা ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে পরামর্শ দিয়েছেন বিশ্বব্যাংক ঢাকা আবাসিক মিশনের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। পাশাপাশি সরকারকে মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে বড় সংকটের আগেই বিকল্প পথ খোঁজার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, শুরুতেই জ্বালানির দাম বাড়ালে হয়তো এমন পরিস্থিতি তৈরি হতো না। দীর্ঘ সময় ধরে জ্বালানিতে ভর্তুকি না দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে মিল রেখে বিক্রি করা দরকার ছিল। এতে মানুষের পকেটে আঘাত লাগত, জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতো। তিনি বলেন, আমাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হচ্ছে তেল আমাদানিতে একটি মাত্র পথের ওপর নির্ভরশীল হওয়া। ধীরে ধীরে বিকল্প পথ বের করতে হবে। পাশাপাশি দেশের ভেতরে ও গভীর সমুদ্রে জ্বালানি অনুসন্ধান করে উত্তোলনের ব্যবস্থা করা।

তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারী ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সহসভাপতি ও অনন্ত গার্মেন্টসের এমডি ইনামুল হক খান বলেন, লোডশেডিংয়ের কারণে অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যবহার করে লোকসানে পণ্য উৎপাদন করতে হচ্ছে। তিনি বলেন, স্বাভাবিক সময়ে ১০ ঘণ্টা কারখানা চালু

থাকে। বর্তমানের ৪-৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় বাকি সময় জ্বালানি ব্যবহার করে জেনারেটর চালাতে হয়। এতে প্রচুর জ্বালানি তেল চলে যায়। তেলের দাম বেড়েছে। ক্রেতাদের সময়মতো পণ্য পৌঁছাতে কারখানা চালু রাখতে হচ্ছে। এতে ব্যয় বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি। কিন্তু ক্রেতারা তো আর বাড়তি দাম দেবে না। নিজেদের লোকসান দিতে হচ্ছে। সময়মতো পণ্য পৌঁছাতে না পারলে ক্রেতারা পরে অর্ডার দেবে না; এমন চ্যালেঞ্জ নিয়ে অর্ডার ধরে রাখতে হচ্ছে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যমতে, গত মার্চে বাংলাদেশ প্রায় ২৮১ কোটি মার্কিন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে, যা গত বছরের মার্চের তুলনায় প্রায় ১৯ শতাংশ কম। সামগ্রিকভাবে চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে দুই হাজার ৮৫৮ কোটি মার্কিন ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় পাঁচ দশমিক ৫১ শতাংশ কম।

এর মধ্যে জ্বালানি সংকটে কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা কমে যাওয়ায় সামনের মাসগুলোতে তৈরি পোশাক রপ্তানির হার আরও কমে যেতে পারে বলে বলে আশঙ্কা করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান গতকাল আমাদের সময়কে বলেন বলেন, এই সংকট কেবল বাংলাদেশের না, পুরো বিশ্ব এই সংকটে ভুগছে। আমরা সংকট সমাধানের চেষ্টা করছি। ফুয়েল পাসে কোথাও কোথাও সুফল মিলছে। কারখানাগুলো প্রতিদিন গড়ে ১০ ঘণ্টা চালু থাকলেও বর্তমানে জ্বালানি সংকট, গ্যাস-বিদ্যুতের অভাবে প্রায় অর্ধেক সময় কারখানা বন্ধ রাখতে হচ্ছে। তবে বড় কারখানাগুলো দ্বিগুণ খরচে কারখানা চালু রেখে পণ্য উৎপাদন করছে। কিন্তু এভাবে কত দিন চলবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তবে শুরুতে তেল কোম্পানিগুলো ফিরিয়ে দিলেও এখন স্বাভাবিক হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিজিএমইএর সভাপতি।

এ অবস্থায় রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের (ইপিজেড) মধ্যে যেসব পোশাক কারখানা রয়েছে, সেগুলোতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট তুলনামূলকভাবে কম। এতে ইপিজেড এলাকার বিশেষ সুবিধা পাচ্ছে। এর মধ্যে আবার সম্প্রতি ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বাড়িয়েছে সরকার। এতে খুব বেশি একটা সুবিধা পাচ্ছেন না তারা। কিন্তু ইপিজেপের বাইরে যে প্রায় আড়াই হাজার কারখানা রয়েছে, সেগুলোর অবস্থা ভয়াবহ খারাপ।

জ্বালানি খরচ বৃদ্ধির পাশাপাশি তৈরি পোশাক খাতে কাঁচামাল, পরিবহনব্যয়সহ আরও অনেক খরচ বেড়ে গেছে বলে জানান ব্যবসায়ীরা। এর মধ্যে বিদেশ থেকে যে তুলা আমদানি করা হয়, সেটার দাম প্রতিকেজিতে ৬০ সেন্ট বা প্রায় আড়াই শ টাকা বেড়েছে। এ ছাড়া পলিস্টার ও নাইলনের মতো পেট্রোলিয়াম বাইপ্রোডাক্টসের দাম হু-হু করে বাড়ছে।

বিশেষ করে, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি তেলের সংকটে উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটায় অনেক সময় শিপমেন্ট বিলম্ব করতে হচ্ছে। এতে বায়াররা অসন্তুষ্ট হচ্ছে। আবার অনেকে কার্গো বিমানে মাল পাঠাতে বলছে, যাতে তারা দ্রুত হাতে পায়। কিন্তু খরচ বাড়লেও বেশির ভাগ বিদেশি ক্রেতা তা দিতে রাজি হচ্ছেন না। এর কারণ হচ্ছে-খরচগুলো বেড়েছে অর্ডার নেওয়ার পরে। নতুন দামে অর্ডার কোট করার পর দেখা যাচ্ছে, বায়াররা অর্ডারটা কনফার্ম করছে না। দাম কমানোর জন্য অপেক্ষা করছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে কাঁচামাল আমদানি থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ে যে বাড়তি খরচ হচ্ছে, সেটার পুরোটাই যাচ্ছে ব্যবসায়ীদের নিজেদের পকেট থেকে।

বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রির (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিদেশি ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে অন্য দেশে চলে যাচ্ছে। তিনি এক ক্রেতার সঙ্গে আলাপচারিতার কথা উল্লেখ করে বলেন, ওই ক্রেতা বলছে, শুনলাম যে তোমার দেশে দুই-তিন মাস পরে আর ইলেকট্রিসিটি থাকবে না, এবং তোমাদের এত অর্ডার দিতে এখন আমাদের টপ ম্যানেজমেন্ট থেকে না করা হচ্ছে। এটা কিন্তু এখন ভারতে যাওয়া শুরু করেছে।

 

ফন্ট সাইজ:
0Shares

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।

TOP
SECURITY ALERT
🛡️
“কেরানীগঞ্জের কণ্ঠ”
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি। এটি একটি AI ভিত্তিক কনটেন্ট প্রোটেক্ট সিস্টেম যা আপনার কার্যকলাপ মনিটর করছে। ভবিষ্যতে অনুমতি ছাড়া কপি করলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হতে পারে।