বসন্তের নরম আলো, হালকা উষ্ণ হাওয়া আর অদৃশ্য ফুলের গন্ধে ভেসে থাকা এক সন্ধ্যায় ছায়ানট মিলনায়তন পরিণত হয়েছিল সুরের ভুবনে। সেই ভুবনের প্রতিটি মুহূর্ত ছিল গভীর নিবেদনে পূর্ণ- সংগীতাচার্য সন্জীদা খাতুনের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর স্মৃতির মেলবন্ধন।
গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় শুরু হওয়া এই বাসন্তী আয়োজনের প্রথমেই মঞ্চে আসে সম্মেলক নৃত্যগীত ‘আমার বনে বনে’। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই সৃষ্টির সুরে ও তালে শিল্পীরা ফুটিয়ে তোলেন প্রকৃতির জেগে ওঠা, ফুলের মেলা আর হৃদয়ের নিভৃত উচ্ছ্বাস। নৃত্য ও সংগীতের সমন্বয়ে মঞ্চজুড়ে তৈরি হয় রঙিন আবহ, যেখানে বসন্ত যেন দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
এরপর ডা. সারওয়ার আলীর কথনে উঠে আসে সন্জীদা খাতুনের শিল্পদর্শন, সংগীতচর্চা ও তার দীর্ঘ পথচলার কিছু স্মৃতিচিত্র। তার কথায় ছিল শ্রদ্ধা, ছিল এক শিল্পগুরু হারানোর ব্যথা, আবার ছিল সেই উত্তরাধিকার বয়ে নিয়ে চলার অঙ্গীকারও।
অনুষ্ঠানের পরবর্তী অংশে ছায়ানটের শিল্পীদের সম্মেলক কণ্ঠে পরিবেশিত হয় কাজী নজরুল ইসলামের ‘দোলা লাগিল’ এবং ‘বসন্ত এলো এলো এলো রে’। দুটি গানেই ছিল ঋতুর দোল, জীবনের উচ্ছ্বাস আর নবজাগরণের অনুরণন। সুরের তরঙ্গে মিলনায়তনের ভেতর ছড়িয়ে পড়ে প্রাণোচ্ছ্বলতা। একক সংগীতে ইফ্ফাত আরা দেওয়ানের কণ্ঠে ‘নয়ন মেলে দেখি, আমায়’ গানটি হয়ে ওঠে এক গভীর আত্মঅন্বেষণের মুহূর্ত। তার কণ্ঠের মাধুর্যে রবীন্দ্রসংগীত যেন শুধু শোনা নয়, অনুভবের এক অন্তরঙ্গ যাত্রায় পরিণত হয়। এরপর নাট্যগীত ‘সুন্দর’ পরিবেশনায় মঞ্চে ধরা পড়ে সুর, অভিনয় ও আবেগের এক অনন্য সংমিশ্রণ। এই পরিবেশনায় শিল্পীরা তুলে ধরেন সৌন্দর্যের দার্শনিক ব্যাখ্যা- যেখানে বাহ্যিকের চেয়ে অন্তরের অনুভূতিই হয়ে ওঠে মুখ্য। পুরো আয়োজনজুড়ে যন্ত্রসংগীতে ছিলেন ফিরোজ খান (সেতার), প্রদীপ কুমার রায় (মন্দিরা), মৃত্যুঞ্জয় মজুমদার ও সুবীর ঘোষ (তবলা), রবিন্স চৌধুরী (কিবোর্ড), মামুনুর রশিদ (বাঁশি) এবং আশিকুল ইসলাম আবির (এস্রাজ)। তাদের সুরসঙ্গত প্রতিটি পরিবেশনাকে দিয়েছে গভীরতা, ছন্দ আর পূর্ণতা। অনুষ্ঠানের শেষ প্রহরে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে সবাই একসঙ্গে মিলিত হন এক অভিন্ন আবেগে-দেশ, সংস্কৃতি ও সংগীতের প্রতি অটল ভালোবাসায়। সব মিলিয়ে, এই বসন্তের আয়োজন ছিল কেবল একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়; এটি ছিল স্মৃতির পুনরুজ্জীবন, শ্রদ্ধার নীরব উচ্চারণ এবং সুরের ভেতর দিয়ে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে উত্তরাধিকার বহনের এক অনন্য প্রয়াস।
এখানে বসন্ত শুধু ঋতু হয়ে আসেনি, এসেছে অনুভব হয়ে-এক জীবন্ত, স্পন্দিত কবিতার মতো।
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।