সকল মেনু

দুই সপ্তাহের অলসতায় বয়স বাড়তে পারে ৫০ বছর

দৈনন্দিন ব্যস্ততার ফাঁকে অনেকেই ভাবেন—কয়েকদিন বিশ্রাম নিলে ক্ষতি কী! কিন্তু সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, এই কয়েকদিন যদি দুই সপ্তাহে গড়ায় তবে শরীরের ওপর তার প্রভাব হতে পারে আশঙ্কাজনক। বিশেষ করে পেশিশক্তির ক্ষেত্রে। বয়সে তরুণ কিংবা প্রবীণ—এই অলসতা মাত্র দুই সপ্তাহেই পেশিশক্তি কমে যায় প্রায় ৩০ শতাংশ। যার প্রভাবে একজন তরুণের বয়স বাড়িয়ে প্রায় ৫০ বছরের বুড়ো বানিয়ে দিতে পারে বলে গবেষণায় দেখা গেছে।

সম্প্রতি জার্নাল অব রিহ্যাবিলিটেশন মেডিসিন-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় এমন তথ্য জানা গেছে। ডেনমার্কের কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক বিষয়টি নিয়ে কাজ করেছেন বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে সিবিএস নিউজ।

গবেষণায় দেখা গেছে, শারীরিকভাবে ফিট একজন তরুণ যদি দুই সপ্তাহ নিষ্ক্রিয় থাকে তাহলে তার পেশিশক্তির বড় একটি অংশ ক্ষতির মুখে পড়ে। তরুণদের ক্ষেত্রে এই হার প্রায় ৩০ শতাংশ।

অর্থাৎ অল্প সময়ের অলসতা তাদের শরীরের সক্ষমতা এমন হয়, যা তাকে বুড়ো মানুষের শক্তির সমপর্যায়ে নিয়ে আসে!
এই শারীরিক অলসতা শুধু তরুণদেরই ক্ষতি করে তা নয়। বয়স্কদের ক্ষেত্রেও ঝুঁকিপূর্ণ। গবেষকরা বলছেন, বয়স নয়—শারীরিক অলসতাই মূলত বিপদ ডেকে আনে। প্রবীণদের মধ্যে যারা নিয়মিত সক্রিয় থাকেন, তারাও যদি হঠাৎ দুই সপ্তাহ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন, তবে তাদের পেশিশক্তি কমে যায় প্রায় ২৫ শতাংশ।

গবেষণায় বিষয়টি যাচাই করতে বয়সভেদে তরুণ এবং বয়স্কদের অংশগ্রহণের সুযোগ ছিল। গবেষণার পুরো সময়জুড়ে অংশগ্রহণকারীদের একটি পা অচল অর্থাৎ নিষ্ক্রিয় রাখা হয়। বিস্ময়করভাবে দেখা গেছে, মাত্র দুই সপ্তাহ পর তরুণ অংশগ্রহণকারীদের পেশিশক্তি কমে গেছে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। অর্থাৎ একজন তরুণের পায়ে এই ক্ষতি যেন হঠাৎ করে ৪০ থেকে ৫০ বছর বয়স বেড়ে যাওয়ার সমান প্রভাব ফেলেছে। এদিকে বয়স্কদের ক্ষেত্রে কমে প্রায় এক-চতুর্থাংশ।

ডেনমার্কের কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর হেলদি এজিং এবং বায়োমেডিক্যাল সায়েন্সেস বিভাগের গবেষক আন্দ্রেয়াস ভিগেলসো বলেন, আমাদের পরীক্ষাগুলোতে দেখা গেছে যে, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা তরুণ ও বয়স্ক—উভয় বয়সের পুরুষদের পেশিশক্তিকে প্রায় একইভাবে প্রভাবিত করে। মাত্র দুই সপ্তাহ একটি পা অচল রেখে দিলে তরুণরা তাদের পেশিশক্তির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হারায়, আর বয়স্করা হারায় প্রায় এক-চতুর্থাংশ। অর্থাৎ কোনো তরুণ যদি দুই সপ্তাহ অচল থাকে, তাহলে তার পায়ের পেশিশক্তি এমনভাবে কমে যায়, যেন তার বয়স কয়েক দশক বেড়ে গেছে।

পেশির পরিমাণের দিক থেকেও পার্থক্য চোখে পড়ার মতো উঠে এসেছে গবেষণায়। সাধারণত বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পেশির পরিমাণ কমতে থাকে। তরুণদের প্রতিটি পায়ে গড়ে বয়স্কদের তুলনায় প্রায় দুই পাউন্ড বেশি পেশি থাকে। কিন্তু গবেষণায় অংশ নেওয়া তরুণরা যখন দুই সপ্তাহ পুরোপুরি অচল ছিল, তখন তারা গড়ে প্রায় ১৭ আউন্স পেশি হারায়।

অন্যদিকে, বয়স্কদের ক্ষেত্রে এই ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ৯ আউন্স। তবে সব বয়সের অংশগ্রহণকারীর ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, পা অচল থাকার সময় তাদের শারীরিক সক্ষমতা কমে গেছে।

গবেষণায় আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে এই গবেষণায়—যাদের শরীরে পেশি বেশি, তাদের ক্ষতিও বেশি।

একই গবেষণার সঙ্গে যুক্ত আরেক গবেষক মার্টিন গ্রাম বলেন, আপনার শরীরে যত বেশি পেশি থাকবে, আপনি নিষ্ক্রিয় হলে তত বেশি পেশি হারাবেন। অর্থাৎ, আপনি যদি ফিট থাকেন এবং পরে যদি নিষ্ক্রিয় হয়ে যান, তাহলে একই সময়ের মধ্যে একজন আনফিট ব্যক্তির তুলনায় আপনার পেশি ক্ষয় বেশি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

তিনি আরও বলেন, বয়স্করা তুলনামূলক কম পেশি হারালেও এবং তাদের ফিটনেস কিছুটা কম কমলেও, এই ক্ষতি তাদের জন্য বেশি গুরুতর হতে পারে। কারণ এটি তাদের সামগ্রিক স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রার মানের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

নিষ্ক্রিয়তার পর শরীরকে আগের অবস্থায় ফেরানোও সহজ নয়। গবেষকদের মতে, পেশিশক্তি পুনরুদ্ধার করতে হলে প্রয়োজন শক্তি-বর্ধক ব্যায়াম, যেমন ওজন তোলা বা রেজিস্ট্যান্স ট্রেনিং। সাইক্লিং বা কার্ডিও ব্যায়াম পেশির ভর ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করলেও শক্তি বাড়াতে তা যথেষ্ট নয়।

দুই সপ্তাহ অচল থাকার পর গবেষণায় অংশগ্রহণকারীরা সাইকেল চালিয়ে ব্যায়াম শুরু করেন। তারা ছয় সপ্তাহ ধরে সপ্তাহে তিন থেকে চার দিন করে অনুশীলন করেন। এই ব্যায়ামের ফলে তারা তাদের শারীরিক সক্ষমতা অনেকটা ফিরে পেলেও, গবেষকরা দেখেছেন যে তাদের পেশিশক্তি পুরোপুরি আগের অবস্থায় ফিরে আসেনি।

গবেষক ভিগেলসো বলেন, দুঃখজনকভাবে বলতে হয় যে, শুধু সাইকেল চালানো এই অংশগ্রহণকারীদের পেশিশক্তি পুরোপুরি পুনরুদ্ধার করার জন্য যথেষ্ট নয়। তবে এটি পেশির ভর ফিরে পেতে এবং আগের ফিটনেস পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করে। যদি আপনি নিষ্ক্রিয়তার পর পেশিশক্তি পুনরুদ্ধার করতে চান, তাহলে আপনাকে অবশ্যই ওজন উত্তোলন বা শক্তি-বর্ধক ব্যায়াম অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

এ বিষয়ে গবেষক মার্টিন গ্রাম বলেন, নিষ্ক্রিয়তার কারণে এত দ্রুত পেশি ক্ষয় হওয়া সত্যিই বিস্ময়কর। আপনি যতদিন নিষ্ক্রিয় থাকবেন, সেই সময়ের প্রায় তিনগুণ সময় লাগে পেশির ভর পুনরুদ্ধার করতে।

গবেষণা এই বার্তা দেয় যে—শরীর যত দ্রুত শক্তি হারায়, তা ফিরে পেতে সময় লাগে তার চেয়েও বেশি। তাই শরীরকে সচল রাখা শুধু ফিট থাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতার জন্য অপরিহার্য। কয়েকদিনের অলসতা হয়তো তেমন কিছু মনে না হলেও, তার প্রভাব জমতে জমতে বড় ক্ষতির কারণ হয়ে উঠতে পারে। তাই ব্যস্ততা, অসুস্থতা বা ছুটির মাঝেও শরীরকে যতটা সম্ভব সক্রিয় রাখতে হবে।

ফন্ট সাইজ:
0Shares

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।

TOP
SECURITY ALERT
🛡️
“কেরানীগঞ্জের কণ্ঠ”
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি। এটি একটি AI ভিত্তিক কনটেন্ট প্রোটেক্ট সিস্টেম যা আপনার কার্যকলাপ মনিটর করছে। ভবিষ্যতে অনুমতি ছাড়া কপি করলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হতে পারে।