ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের কোনাখোলা এলাকায় জনবসতিপূর্ণ স্থানে অনুমোদন ছাড়াই একটি এলপিজি রিফিলিং প্লান্ট পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা না মেনে এবং সরকারি বিধিমালা উপেক্ষা করে অবৈধভাবে দীর্ঘদিন ধরে সেখানে গ্যাস রিফিলিং কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। খালি সিলিন্ডার কিনে তাতে গ্যাস ভরে বিভিন্ন কোম্পানির সিল দিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে। আশপাশের বাসিন্দাদের অভিযোগ, অবৈধ এ রিফিল কোম্পানির নিকটবর্তী গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনাও বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে রয়েছে।
সরেজমিন দেখা যায়, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার বোয়ালি মৌজার কোনাখোলা রাজাবাড়ি রোডে ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের পেছনে ‘কেরানীগঞ্জ স্যাটেলাইট এলপিজি প্লান্ট’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে। জানা গেছে, প্লান্টটি ম্যানেজার মো. জসিমের তত্ত্বাবধানে চলছে। অভিযোগ রয়েছে, এখান থেকে দেশের বিভিন্ন স্বনামধন্য কোম্পানির এলপিজি সিলিন্ডারে অবৈধভাবে গ্যাস রিফিলিং করা হয়। প্লান্টটিতে ভূ-উপরিস্থ অবস্থায় ৫০ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার তিনটি গ্যাসাধার স্থাপন করা হয়েছে। তবে এলপিজি বিধিমালা-২০০৪ অনুযায়ী এ ধরনের গ্যাসাধারের চারপাশে কমপক্ষে ৮ ফুট নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব নিরাপত্তা বিধি যথাযথভাবে মানা হচ্ছে না এবং সীমিত জায়গার মধ্যেই গ্যাস পাম্প স্থাপন করা হয়েছে।
এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা জানান, দীর্ঘদিন ধরে একজন ব্যক্তি এ এলপিজি রিফিলিং প্লান্ট পরিচালনা করছেন। তাদের ভাষ্য, এত অল্প জায়গার মধ্যে এত বড় গ্যাস রিফিলিং পাম্প কীভাবে পরিচালনা করা হচ্ছে, তা আমাদের বোধগম্য নয়। তাদের বৈধ কাগজপত্র আছে কি না, তা নিয়েও আমাদের সন্দেহ রয়েছে। স্থানীয়দের আরো দাবি, প্লান্টটি পরিচালনার সঙ্গে জসিম নামেই দুজন ব্যক্তি জড়িত। তাদের মধ্যে একজন ডিলার হিসেবে কাজ করেন এবং অন্যজন ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ডিলার জসিম বলেন, আমি মূলত প্লান্ট থেকে সিলিন্ডারে গ্যাস ভরে বাইরে সরবরাহ করি। বসুন্ধরা এলপি গ্যাস, ওমেরা এলপিজি, অরিয়ন গ্যাস ও বিএম এলপি গ্যাসের সিলিন্ডারের লোগো ও যন্ত্রাংশ সরবরাহ করি। এসব কোম্পানির সিলিন্ডারে গ্যাস ভরে বিভিন্ন দোকানে সরবারহ করার কাজটি আমি করে থাকি।
প্লান্টটি কতদিন ধরে চলছে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ আমল থেকে এটি চলছে। তখন প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই কাজ করা হতো। সেই সময়ের কয়েকজন অসৎ কর্মকর্তা এ অবৈধ প্লান্টের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এদিকে কেরানীগঞ্জ স্যাটেলাইট এলপিজি প্লান্টের ম্যানেজার মো. জসিমকে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। স্থানীয়দের মতে, প্লান্টটির সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো এর অবস্থান। প্লান্টটির মাত্র ১০০ গজের মধ্যে ঢাকা পল্লী বিদ্যুৎ-৪ এর কোনাখোলা সাবস্টেশন অবস্থিত, যা একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কেপিআই স্থাপনা এবং অত্যন্ত অগ্নিসংবেদনশীল।
এলাকাবাসীর আশঙ্কা, এলপিজি প্লান্টে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে মুহূর্তেই ৫০ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার গ্যাসাধার বিস্ফোরিত হয়ে আশপাশের স্থাপনা; বিশেষ করে শত কোটি টাকা মূল্যের বিদ্যুৎ সাবস্টেশন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সরেজমিন আরো দেখা যায়, প্লান্টটি একটি জনবহুল এলাকার মধ্যে অবস্থিত। ফলে এখানে কোনো ধরনের অগ্নিকাণ্ড বা দুর্ঘটনা ঘটলে আশপাশের অসংখ্য মানুষ চরম ঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। স্থানীয়দের দাবি, দিনে তেমন কোনো কার্যক্রম চোখে না পড়লেও রাত ১২টার দিকে ট্রাকে করে গ্যাস সিলিন্ডার আনা-নেওয়া করতে দেখা যায়। তাদের মতে, বসুন্ধরাসহ বিভিন্ন কোম্পানির সিলিন্ডারে এখানে গ্যাস রিফিলিং করা হয়। এ বিষয়ে কেরানীগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের দায়িত্বরত সিনিয়র স্টেশন অফিসার মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, আমি বিষয়টি সম্পর্কে এখনো পুরোপুরি অবগত নই।
এলপিজি প্লান্টটির ফায়ার লাইসেন্স সম্পর্কে এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাসান মুঠোফোনে জানান, কেরানীগঞ্জ স্যাটেলাইট এলপিজি প্লান্টের লাইসেন্স আমরা দিইনি। প্রতিষ্ঠানটি তাদের কোনো লাইসেন্স নবায়নও করেনি। এ বিষয়ে এরই মধ্যে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এদিকে গ্যাস প্লান্টটি কোনাখোলা বৈদ্যুতিক সাবস্টেশনের জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ- এ বিষয়ে ঢাকা পল্লী বিদ্যুৎ-৪ এর অপারেশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স বিভাগের এজিএম এ এস এম মোশাররফ হোসেন নান্নু বলেন, বিষয়টি স্পর্শকাতর। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে তদন্তসাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ব্যাপারে কেরানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ওমর ফারুক জানান, আমি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নই। অতি দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।